ক্ষীরগ্রাম যোগাদ্যা সতীপীঠ - ইতিহাস, অলৌকিক কাহিনী ও গ্রামের তথ্য

 ক্ষীরগ্রাম যোগাদ্যা সতীপীঠ 

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকে অবস্থিত ক্ষীরগ্রাম। এই গ্রামের নামের সাথে জড়িয়ে আছে এক প্রাচীন শক্তিপীঠের ইতিহাস। এখানেই রয়েছে মা যোগাদ্যার মন্দির, যা ৫১ সতীপীঠের মধ্যে একটি।


Khirgram Jogadya Mondir

পুরাণ অনুসারে দেবী সতীর ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ এই স্থানে পতিত হয়েছিল। সেই কারণে এই স্থান সতীপীঠ হিসাবে পূজিত হয়। দেবীর নাম যোগাদ্যা এবং ভৈরবের নাম ক্ষীরকণ্ঠ। দেবী এখানে দশভূজা মহিষমর্দিনী রূপে পূজিত হন। মূর্তিটি কষ্টি পাথরের তৈরি।


এই পীঠের সাথে রামায়ণের একটি যোগও রয়েছে। বলা হয় লঙ্কার রাজা রাবণের পুত্র মহীরাবণ রাম ও লক্ষণকে পাতালে নিয়ে গিয়ে তার আরাধ্যা দেবী ভদ্রকালীর কাছে বলি দিতে চেয়েছিল। হনুমান মহীরাবণকে বধ করে রাম লক্ষণকে উদ্ধার করেন এবং দেবী ভদ্রকালীকে পাতাল থেকে উদ্ধার করে এই ক্ষীরগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে দেবী এখানে ভদ্রকালী নামেও পরিচিত।


এই মন্দিরের সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল দেবী সারা বছর জলের নিচে থাকেন। মন্দিরের পাশেই রয়েছে বিশাল ক্ষীরদিঘি। সেই দিঘির জলের তলায় দেবীকে রাখা হয়। বছরে মাত্র কয়েকদিন দেবীকে জল থেকে তোলা হয়। সাধারণ ভক্তরা বছরে দুই দিন দেবীর পূর্ণ দর্শন পান। একটি হল বৈশাখ সংক্রান্তির দিন এবং অন্যটি জ্যৈষ্ঠ মাসের ৪ তারিখে। এছাড়া আষাঢ়ী নবমী, বিজয়া দশমী, ১৫ পৌষ এবং মাঘ মাসের মাকরী সপ্তমীতে দেবীকে জল থেকে তুলে পূজা করা হলেও সর্বসাধারণের জন্য দর্শন উন্মুক্ত থাকে না।


মন্দিরে কোন স্থায়ী বিগ্রহ থাকে না। গর্ভগৃহে একটি বেদী আছে। সেই বেদীতেই নিত্য পূজা হয়। কথিত আছে কালাপাহাড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পুরোহিতরা মূর্তিটি দিঘির জলে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেই থেকেই এই প্রথা চলে আসছে।


এই পীঠকে ঘিরে দুটি অলৌকিক ঘটনা প্রচলিত আছে। প্রথম ঘটনাটি নরবলি বন্ধ হওয়া নিয়ে। আগে এখানে নরবলির প্রথা ছিল। একবার এক ব্রাহ্মণের একমাত্র ছেলের পালা পড়ে। ব্রাহ্মণ পরিবার নিয়ে রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছিলেন। পথে এক বৃদ্ধার সাথে দেখা হয়। বৃদ্ধা সব শুনে বলেন আমিই যোগাদ্যা, আজ থেকে নরবলি বন্ধ। সেই থেকে এখানে মহিষ বলি হয়।


দ্বিতীয় ঘটনাটি শাঁখা পরা নিয়ে। এক শাঁখারি ফেরি করে শাঁখা বিক্রি করছিলেন। ধামাসদিঘির পাড়ে এক যুবতী তার কাছে শাঁখা পরতে চায়। শাঁখা পরার পর সে বলে মন্দিরের কুলুঙ্গিতে টাকা রাখা আছে নিয়ে নিও, আমি পুরোহিতের মেয়ে। শাঁখারি মন্দিরে গিয়ে পুরোহিতকে বললে পুরোহিত বলেন তার কোন মেয়ে নেই। কিন্তু কুলুঙ্গিতে সত্যিই টাকা পাওয়া যায়। তখন সবাই বোঝে স্বয়ং দেবী শাঁখা পরেছেন। আজও বৈশাখ সংক্রান্তিতে মাকে শাঁখা পরানো হয় এবং সেই শাঁখারির বংশধররাই এই কাজ করেন।


ক্ষীরগ্রাম গ্রামটি তিনটি মৌজা নিয়ে গঠিত। গ্রামের অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। এখানে ধান ও আলুর চাষ ভালো হয়। গ্রামে ক্ষীরদিঘি, ধামাসদিঘি সহ বহু পুরাতন পুকুর রয়েছে। মন্দিরের পাশেই ভৈরব ক্ষীরকণ্ঠ শিবের মন্দির রয়েছে একটি টিলার উপর।


কিভাবে যাবেন। হাওড়া থেকে কাটোয়া গামী ট্রেনে কৈচর স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে টোটোতে প্রায় আট কিলোমিটার। কাটোয়া থেকে দূরত্ব তেইশ কিলোমিটার এবং বর্ধমান থেকে পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার। বাস ও প্রাইভেট গাড়িতে সহজেই যাওয়া যায়। মন্দির কমিটির গেস্ট হাউসে থাকার ব্যবস্থা আছে। দুপুরে ভোগ প্রসাদের ব্যবস্থাও আছে।


প্রতি বছর বৈশাখ সংক্রান্তিতে এখানে বড় মেলা বসে। প্রায় পনেরো দিন ধরে এই মেলা চলে। দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত আসেন। এই সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে উৎসবের আমেজ থাকে।


আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গের শক্তিপীঠগুলি দর্শন করতে চান তবে ক্ষীরগ্রাম যোগাদ্যা মন্দির অবশ্যই আপনার তালিকায় রাখুন।


Tags: Khirgram, Jogadya Temple, Satipeeth, Purba Bardhaman, Mangalkote

Post a Comment

Thank you visit again

নবীনতর পূর্বতন